আজ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবসেও উদাসীন্যে অবহেলিত শ্যামাপ্রসাদ

উপানন্দ ব্রহ্মচারী

ভারতের প্রায় সমস্ত রাজ্য যথাযোগ্য মর্যাদায় তার স্থাপনা দিবস পালন করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ এক্ষেত্রে একটি বিরল ব্যতিক্রম। সরকারি বা বেসরকারি কোনও উদ্যোগেই “পশ্চিমবঙ্গ স্থাপনা দিবস” অথবা “পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালনে তৎপর নয়। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বারংবার ভাঙাগড়ার নিরিখে আগামী জনতাত্তবিক পরিবর্তনের আশঙ্কাজনক বাতাবরণে, এই রাজ্য সৃষ্টি ও তার ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫-এর ধারা অনুসারে ১৯৩৭ সালে বাংলা একটি স্থায়ত্বশাসিত প্রদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ ক্ষমতা প্রত্যাহারের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশকে দ্বি-বিভাজিত করে পাকিস্তান এবং ভারত এই দুই ডোমিনিয়ন গঠনের সময় পর্যন্ত বাংলায় এই অবস্থা বজায় ছিল। বাংলার পূর্ব ভাগ যেখানে মুসলমানের সংখ্যাধিক্য ছিল তা পূর্ব পাকিস্তান (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ) এবং পশ্চিমভাগ পশ্চিমবঙ্গ নাম নিয়ে ভারতে থেকে যায়। বাস্তবে বাংলার বিভাজন, সীমানা নির্ধারণের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা এবং ক্রমাগত অ- মুসলমান, প্রধানত হিন্দু উদ্বাস্তুুদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগমন ইত্যাদি সমস্যা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গী হয়। ১৯৪৭-এর পর ইতিমধ্যেই ঘনজনবসতি সম্পন্ন রাজ্যে দশ লক্ষের বেশি উদ্বাস্তুদের আগমন এবং গিয়ে বাংলা প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়।

১৯৫০-এ দেশীয় রাজ্য কোচবিহারকে আইন পাশ করে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। ১৯৫৬ সালে এই রাজ্য নবরূপে পুনর্গঠিত হয়। বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গ ৩,১৪০ বর্গমাইল (৮,১৩০ বর্গকিমি) জায়গা লাভ ভূমি প্রদান করা হয় যার দ্বারা পূর্বে বিভক্ত এই রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়।

কিন্তু ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির এরূপ একটি সোজাসাপটা অপ্রতুল বর্ণনা প্রকৃত সত্য ইতিহাস উদঘাটন করতে পারে না। অবিভক্ত বাংলা এবং প্রাক বিভাজিত ভারতে মুসলিম লিগ প্রত্যক্ষ সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলা এবং পাঞ্জাবের একটা বিরাট অংশ কব্জা করতে চাইছিল। হিন্দুদের তাজা রক্তে হাত রাঙিয়ে পাকিস্তানের সবুজ ইসলামিক নকশা তৈরির মাধ্যমে তারা তাদের মতলব হাসিল করতে চাইছিল।

সেই পরিস্থিতিতে বাংলার পশ্চিম অংশকে বাঁচাতে এবং বাঙালি হিন্দুর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরির জন্য, গঙ্গার পূর্ব তীরে বাংলায় এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হয়। তিনি ভারতের অখণ্ডতার জ্বলন্ত দিশারী ছিলেন। তৎসত্ত্বেও যখন তিনি দেখলেন যে ভারত বিভাজন এবং পাকিস্তান সৃষ্টি অনিবার্য, তখন সমমনস্ক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিলিত হয়ে দাবি করলেন ভারত বিভাজনের মত বাংলা বিভাজনও যেন সমনীতির ভিত্তিতে হয়। সেইজন্য বাংলার একটা অংশ যার বর্তমান নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’, দুর্বিপাক থেকে রক্ষা পেয়েছিল এবং মুসলিম লিগের থাবা থেকে মুক্ত হয়ে ভারতীয় ইউনিয়নে থেকে গিয়েছিল। সেই মহান ব্যক্তিত্ব আর কেউ নন, তিনি হলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তিনি উদারবাদী এবং মুক্তমনা বাঙালি তথা বাঙালি হিন্দুর পরিত্রাতা এবং প্রকৃত অর্থে পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা।

প্রশাসনিক সুবিধার্থে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসক দ্বারা প্রথম বঙ্গ বিভাজন কার্যকরী করা হয়েছিল পূর্ব এবং পশ্চিম বাংলা নামে দুটি প্রদেশ রূপে। বাংলা প্রদেশ দ্বি- বিভাজিত হয়ে পশ্চিমভাগ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পূর্বভাগ মুসলমান গরিষ্ঠ অঞ্চল রূপে সৃষ্টি হয়। ১৯০৫-এর এই বিভাজন পূর্ববাংলায় বিপুল পরিমাণ হিন্দু সংখ্যালঘু এবং পশ্চিমবঙ্গ যেখানে বেশ কিছু মুসলমান সংখ্যালঘু মানুষকে থেকে যেতে বাধ্য করে। বিভাজনে বিশ্বাসী মুসলমানরা তাদের নিজস্ব প্রদেশ লাভ করে, কিন্তু হিন্দুরা তা পায় না। এই মতবিরোধ হিংসা এবং প্রতিবাদের পথে ঠেলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাবল্যে ১৯১১ সালে দুটি প্রদেশ পুনরায় একত্রিত হয়।

হিন্দু-মুসলমানের যে চিরন্তন মতবিরোধকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজ শাসক ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের চেষ্টা করেছিল, সেটি এবং বিভাজন সংক্রান্ত আইনকানুন ১৯৪৭ পর্যন্ত জারি ছিল বিবদমান পক্ষগুলির রাজনৈতিক চাহিদা পূরণ করার জন্য। ফলস্বরূপ দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাজনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই তত্ত্ব অনুসাইে ধর্মীয় ভিত্তিতে ভারত বিভাজিত হয়

এবং বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লিগের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাবর্দী একটা বিপজ্জনক পরিকল্পনা রচনা করেন, যার মাধ্যমে একটি স্বাধীন বাংলা রাজ্য সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়, যেটি অবিভাজ্য রূপে পাকিস্তান অথবা ভারত কারোর সঙ্গেই থাকবে না। সোহরাবর্দী অনুধাবন করেছিলেন, যদি বাংলা ভাগ হয় তাহলে পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে তা অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে আসবে। – অর্থাৎ সমস্ত কয়লাখনি, চটকল সহ অন্যান্য শিল্প, কলকারখানা পশ্চিমভাগে থেকে যাবে যে এলাকা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ। সব থেকে বড় কথা হল তৎকালীন বৃহত্তম শহর কলকাতা, শিল্প-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল এবং বৃহত্তম বন্দর যা এই পশ্চিম অংশেই থেকে যাবে। সোহরাবর্দী ১৯৪৭ সালের ২৪ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে একথা সবিস্তারে ব্যক্ত করেন।

দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে এক পৃথক মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির জন্য মুসলিম হোমল্যান্ড তৈরির উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ শাসনকালে তৈরি রাজনৈতিক দল মুসলিম লিগের সঙ্গে সোহরাবর্দীর উপরোক্ত পরিকল্পনার বিষয়ে একপ্রকার সংঘাত সৃষ্টি হয় এবং প্রাথমিকভাবে প্রাদেশিক মুসলিম লিগের নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। একদিকে বর্ধমান লিগের নেতা আবুল হাসিম এটি সমর্থন করেন, অপরদিকে নুরুল আমিন এবং মহম্মদ আক্রাম খান প্রাথমিকভাবে এর বিরোধিতা করেন। মহম্মদ আলি জিন্না সোহরাবর্দীর যুক্তি অনুধাবন করেছিলেন এবং এই প্রস্তাবে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। জিন্নার অনুমোদনের পর সোহরাবর্দী তাঁর প্রস্তাবের সপক্ষে লোক জোগাড় করতে থাকেন। অপরদিকে কংগ্রেসের তরফে হাতেগোনা কয়েকজন নেতা এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন। তাঁদের মধ্যে বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা

কিন্তু

শরৎচন্দ্র বোস অর্থাৎ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের দাদা এবং কিরণশঙ্কর রায় ছিলেন উল্লেখযোগ্য । যদিও বাংলা প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির অধিকাংশ নেতা এবং নেহরু ও প্যাটেলসহ কংগ্রেস নেতৃত্ব এটিকে প্রত্যাখ্যান করেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ‘হিন্দু মহাসভা’ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে এটির তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি ছিল এই যে পরিকল্পনাটি সোহরাবর্দীর একটি চক্রান্ত তথা বঙ্গপ্রেমের নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়, যা দিয়ে ভাগাভাগি না করে কলকাতা শহর সহ শিল্পোন্নত পশ্চিম অংশকে মুসলিম শাসনের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তারা যুক্তি দেখায়, এই পরিকল্পনা দ্বারা একটি সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্র গঠিত হবে এবং বাস্তবে এটি একটি আদর্শ পাকিস্তান হবে যেখানে চিরকালের জন্য সংখ্যালঘু হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দয়ায় বেঁচে থাকবে।

কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন লাভ করা সম্ভব নয় জেনেও শরৎ বোস এবং সোহরাবর্দী আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন যতক্ষণ না এটি প্রস্তাবিত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোয় চুক্তির আকার নেয়। সোহরাবদীর মতো বোসও ভেবেছিলেন যে, এই বিভাজন বাংলার অর্থনীতিকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং প্রায় অর্ধেক হিন্দু জনগণ পাকিস্তানি সীমার অন্তর্ভূক্ত হবে। তাতে হিন্দুদের কোনও ক্ষতি হবে না। যদিও এটি একটি বৃহদাকার রাজনৈতিক চুক্তি, তবুও সেই প্রস্তাব তৃণমূল স্তরে বিশেষত হিন্দুদের তরফে কোনও সমর্থন লাভ করেনি। সেই সময় মুসলিম লিগ দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রচার চালাতে থাকে ও পূর্বের ছয় বছরে সোহরাবর্দীর মন্ত্রিসভায় হিন্দুদের সংখ্যা কমানোর বিষয়ে তীর্যক মন্তব্য করতে থাকে। কিন্তু ১৯৪৬-এ প্রত্যক্ষ সংঘাতে (Direct Action) ভয়ঙ্কর দাঙ্গার বিষয়ে বহু হিন্দু বিশ্বাস করতেন যে, এই ঘটনাগুলি রাষ্ট্রীয় মদতে ঘটেছে তাই বাঙালি হিন্দুরা মুসলিম লিগ বা সোহরাবর্দীর কারোর প্রতিই আস্থাশীল ছিলেন না। কিছুদিনের মধ্যেই পৃথক তথা যুগ্ম ভোটের প্রশ্নে বোস এবং সোহরাবদীর মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। সোহরাবর্দী মুসলমান এবং অমুসলমানদের ক্ষেত্রে পৃথক ভোটাভুটির জন্য জোর করতে থাকেন। শরৎ বোস এর বিরোধিতা করেন। কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন না থাকায় তিনি (শরৎ বোস) সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন এবং অখণ্ড বাংলার পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়।

ভারতকেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন। সঠিক সময়ে তিনি বাঙালি হিন্দুদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আইনসঙ্গত দাবি পেশ করেন, যাতে অখণ্ড সার্বভৌম বাংলার নামে বাঙালি হিন্দুকে পদপিষ্ট করার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের কব্জা থেকে মুক্ত করে ভারতের সীমানার মধ্যে থেকে বাঙালি হিন্দুর জন্য একটা পৃথক বাসভূমি তৈরি করা

যায়।

ব্যবস্থা অনুসারে ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলা আইনসভার সদস্যবৃন্দ বাংলা বিভাজনের প্রস্তাবের বিষয়ে তিনটি পর্যায়ে ভোটদান করেন। কক্ষের যৌথ অধিবেশনে আইনসভার সকল সদস্যদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে গিয়ে ১২৬টি ভোট বিভাজনের বিপক্ষে এবং ৯০টি ভোট গণপরিষদে (ভারত) যোগদানের পক্ষে পড়ে।

তখন সংখ্যাধিক্য অঞ্চলের সদস্যদের নিয়ে একটি পৃথক অধিবেশনে একটা বাংলার মুসলমান মতামত পাশ হয়। এখানে বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে এবং নতুন আইনসভায় (পাকিস্তান) যোগদানের পক্ষে ১০৬-৩৫ অনুপাতে ভোট পড়ে।

তৎপরে পৃথক এক অধিবেশনে বাংলার অমুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার সদস্যদের দ্বারা প্রদেশ ভাগের পক্ষে

৫৮-২১ অনুপাতে ভোট পড়ে ।

মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী যে কোনও পর্যায়ে বিভাজনের পক্ষে একমাত্র একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা “বাংলা বিভাজনের ভোটাভুটি প্রদেশ বিভাজনের পক্ষে যায় এবং ফলস্বরূপ ২০ জুন সভার কার্যবিবরণীতে বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তখন পশ্চিমবঙ্গকে ভারতীয় ইউনিয়নের অধীন এবং পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তান ডোমিনিয়নের অন্তর্গত প্রদেশ হিসাবে সৃষ্টি করা হয়। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায়, শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন এই পশ্চিমবঙ্গের রূপকার।

মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী  অনুযায়ী ৭ জুলাই একটি গণভোট গৃহীত হয় এতে শ্রীহট্টের নির্বাচকমণ্ডলী পূর্ববাংলায় যোগদানের পক্ষে ভোট দেন। পুনরায় সীমানা নির্ধারণ কমিশন প্রধান স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, দুটি নতুন সৃষ্ট প্রদেশের সীমানা ভাগ করে দিতে হবে। আর ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭ ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে যথাক্রমে ১৪ এবং ১৫ আগস্ট।

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি মুসলিম লিগের বিভাজন নীতি এবং সাম্প্রদায়িক অপপ্রচারের হাত থেকে নীতি গ্রহণ করেন। মুখার্জি এবং তার অনুগামীরা সর্বদা সহনশীলতা এবং মুসলিম জনগণের সুস্থ সমৃদ্ধশালী ও সুরক্ষিত অবস্থানটি প্রাথমিক গুরুত্বের বিষয় রূপে বিবেচিত হয়।

কিন্তু পূর্ব বাংলার নোয়াখালি গণহত্যাকাণ্ডে মুসলিম লিগের দ্বারা বিপুল সংখ্যক হিন্দুকে হত্যার কারণে শ্যামাপ্রসাদের বিশ্বাস আহত হয়েছিল। তারপর থেকেই মুখার্জি বাঙালি হিন্দুর স্বার্থরক্ষায় কঠোর মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।

ড. মুখার্জি প্রাথমিকভাবে ভারত বিভাজনের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ১৯৪৬-৪৭ সালের দ্বারা পরিচালিত সরকার ও মুসলমান রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে হিন্দুদের ভাগ্যকে নিয়ে তিনি ছিনিমিনি খেলতে চাননি। প্রকৃতপক্ষে ড. মুখার্জি তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও এবং মুসলমান নেতৃবৃন্দকে কার্যত আচ্ছন্ন করে ফেলেন। তৎকালীন মুসলমান গারষ্ঠ বাংলায় ভারতকেশরী গর্জন করে ওঠেন যাতে বাংলার পশ্চিম অংশে বাঙালি হিন্দুদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে হিন্দু সংখ্যাবহুল এলাকা নিয়ে একটি পৃথক রাজ্য সংগঠিত হয়।

ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যদি পাকিস্তান ভাগ করে বাঙালি হিন্দুর নিরাপত্তা রক্ষার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির দাবি না জানাতেন, তাহলে কী হত? তাহলে নিশ্চিতভাবেই জেহাদি মুসলমানদের কবল থেকে বাঙালি রক্ষা পেত না। আর বাংলাদেশে আজ বাঙালি হিন্দু কিংবা পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দুদের যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, বিপুল সংখ্যক বাঙালি হিন্দুকেও আজ সেই একই পরিস্থিতির শিকার হতে হত। ঈশ্বর যে এই বাঙালি হিন্দু নেতাকে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত শান্তিকামী, উদার, সহিষ্ণু এবং সংস্কৃতিপরায়ণ হিন্দুর পরিত্রাতা রূপে তাঁর গুরুদায়িত্ব সুচারুরূপ পালন করেছিলেন।

ভারতের অন্য রাজ্যগুলি যখন নিজ নিজ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবসে তৎপর, তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন না করা যথেষ্ট রহস্যজনক। নিজ কর্তব্য ও সরকারের অপরিসীম ঔদাসীন্য পশ্চিমবঙ্গবাসীকে অবশ্যই ব্যথিত করে।

২০ জুন পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবসে প্রতি বছর বাঙালি হিন্দুর অবশ্যই উচিত পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করা। তাকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি হিন্দুর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ড. মুখার্জির দার্শনিক চিন্তাধারাকে সম্মান জানানোর জন্য পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন অবশ্যকর্তব্য। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদান বর্তমান প্রজন্মের পশ্চিমবঙ্গবাসীর একটি আবশ্যিক কর্তব্য। পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ইতিহাস এবং স্রষ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অস্বীকার জনিত সরকারি ও রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার ও কলঙ্ক অপনোদনের জন্য আজ পশ্চিমবঙ্গবাসীকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে।

সূত্র:

১) এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা

২) বিদ্যুৎ চক্রবর্তী লিখিত বাংলা ও অসমের বিভাজন (The Partition of Bengal & Assam)

৩) দীনেশ চন্দ্র সিংহ লিখিত “গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, এবং “নোয়াখালি গণহত্যা

 

— সূত্র: দৈনিক স্টেটসম্যান, ২০ জুন ২০১৪ |