অবিভক্ত ভারতের বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় ২০শে জুন ১৯৪৭ আইনসভার সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি হয়। ৩রা জুলাই ১৯৪৭ গঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মন্ত্রীসভা। অথচ স্বাধীনতা উত্তর পশ্চিমবঙ্গে এই ইতিহাস কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। বলা বাহুল্য নানান স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবে এই ইতিহাসকে জনমানস থেকে মুছে ফেলা হয়।
ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার স্বপ্ন দেখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ মুক্ত চিন্তা, প্রগতিশীলতা এবং মানব সভ্যতার অগ্রগতির আলোকবর্তিকা। পশ্চিমবঙ্গবাসীর দুর্ভাগ্য, যদুনাথ সরকারের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। তার পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ বারে বারে দেখেছে মুক্ত চিন্তার উপর আঘাত। ২০০৭-এ তসলিমার বিতাড়নকে, পশ্চিমবঙ্গের মুক্তচিন্তার কফিনে শেষ পেরেক বলা যায়। পশ্চিমবঙ্গে যে কতিপয় নির্ভীক মানুষ এর প্রতিবাদ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পরিবেশবিদ ডঃ মোহিত কুমার রায়। ২০১১-তে এই নির্ভীক মানুষদের সিংহভাগই পরিবর্তনের সঙ্গী হয়ে, আদর্শ বিসর্জন দিয়ে বিদ্বজ্জন বলে পরিচিত হলেন। এই প্রেক্ষাপটে ডঃ মোহিত কুমার রায় প্রতিষ্ঠা করলেন‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ নামক একটি চিন্তাগোষ্ঠী, যার মূল কথা হল – পশ্চিমবঙ্গ শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, পশ্চিমবঙ্গ বাঙালির মুক্ত অস্তিত্বের ভাবনা।
২০১২ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’-র একটি ঘরোয়া আলোচনায় ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’-এর প্রস্তাবটি উঠে আসে। খতিয়ে দেখা হয়, পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য যার কোনো রাজ্য দিবস নেই। কিন্তু সময়ের অভাবে সেই বছর পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করা সম্ভব হয়নি। ২০১৩-তে, পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষ্যে ঘোষ কেবিনে একটি আলোচনা চক্রের আয়োজন করে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ২০১৪-তে থিওসফিক্যাল সোসাইটি হলে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। বক্তব্য রাখেন লেখিকা এষা দে, অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস, অধ্যাপক তথাগত রায়, সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত এবং ডঃ মোহিত কুমার রায়। তিল ধারণের জায়গা ছিল না হলে, বহু মানুষ বাইরেই দাঁড়িয়েছিলেন। সেই শুরু। তারপর থেকে প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে পালিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ দিবস।
২০১৫-তে, কলকাতার বাইরে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের বার্তাকে ছড়িয়ে দিতে হাবড়াতে একটি উদ্বাস্তু সংগঠনের সাথে যুগ্মভাবে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ২০১৬-তে একাডেমী অফ ফাইন আর্টসে একটি আলোচনাচক্র আয়োজন করে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ২০১৭-তে ডঃ মোহিত কুমার রায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির উদ্বাস্তু সেল পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করে। ২০১৭ থেকেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সদর দপ্তরের সামনে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন শুরু হয়। ২০১৮-তে পশ্চিমবঙ্গের জন্য এবং ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রিসার্চ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে রামমোহন লাইব্রেরি হলে পালিত হয় পশ্চিমবঙ্গ দিবস। ২০১৯-এ পশ্চিমবঙ্গ দিবসে শ্রদ্ধানন্দ পার্ক থেকে শ্যামবাজারে নেতাজি মূর্তির পাদদেশ পর্যন্ত এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করে হিন্দু সংহতি। রামমোহন লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠান করে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। এই ধারা বজায় রেখে ২০২৪-এর ২০শে জুন বৈভবী শাম্ভাবী ফাউন্ডেশন আর নিও ন্যাশনালিস্টের উদ্যোগে কলকাতার মানিকতলার কাছে রায়া দেবনাথ সভাগৃহে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করা হয়। সেদিনও সভাগৃহে সমস্ত আসন ভরে যাওয়ায় গোটা অনুষ্ঠানটি দাঁড়িয়ে শুনতে বাধ্য হয়েছিলেন বহু মানুষ। ডঃ মোহিত কুমার রায়ের পাশাপাশি বক্তব্য রেখেছিলেন দেবজিৎ সরকার এবং ডঃ প্রগতি বন্দোপাধ্যায়।
২০২০-এ প্রথমবার বিধানসভায় পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের উদ্দেশ্যে বিধানসভার স্পিকারকে চিঠি দেন বিজেপির বিধায়ক দুলাল বর। প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। ২০২১-এ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ২৫ জন বিধায়ককে নিয়ে বিধানসভার গেটের সামনে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করেন। ২০২২-এ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি বিধায়করা বিধানসভা ভবন থেকে পদযাত্রা করে ময়দানে অবস্থিত ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মূর্তি সংলগ্ন উদ্যানে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করেন। সেই থেকে প্রতিবছর ময়দানে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালিত হচ্ছে।
২০২৩-এ পশ্চিমবঙ্গের লোকভবনে রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস রাষ্ট্রপতির নির্দেশ অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের লোকভবনেও ২০শে জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালিত হয়। সেই থেকে প্রতিবছর পশ্চিমবঙ্গের লোকভবনে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালিত হচ্ছে।
— কল্যাণ সরকার